ফতওয়া কোডঃ 236-তাখু-10-03-1448
প্রশ্নঃ
একটি পারিবারিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শরয়ি বিষয়ে আপনার পরামর্শ/ফতোয়া প্রয়োজন। বিষয়টি তালাক সংক্রান্ত হওয়ায় বিস্তারিত লিখতে হচ্ছে—মেইলটি একটু বড় হয়ে যাওয়ার জন্য দুঃখিত। অনুগ্রহ করে কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে বিষয়টি পরিষ্কার করে জানালে আমরা অত্যন্ত উপকৃত হব।
ঘটনাটি আমার মেঝো ভাই ও ভাবির মধ্যে ঘটেছে। তাদের বিবাহিত জীবনের প্রায় পাঁচ বছর হতে চলেছে এবং তাদের সাড়ে তিন বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। এর আগে তাদের মধ্যে কখনো তালাকের কোনো ঘটনা বা এ ধরনের কথা হয়নি।
সম্প্রতি WhatsApp-এ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কিছু কথা কাটাকাটি হচ্ছিল। একপর্যায়ে আমার ভাবি রাগের মাথায় স্বামীকে “তুই” বলে সম্বোধন করেন। এতে আমার ভাই কিছুটা রাগান্বিত হন এবং তাকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে লিখতে চান:
“Tore 100 ber talak dimu”
কিন্তু মোবাইলের কিবোর্ডের typing/Auto-correct-এর কারণে “dimu” লেখার পরিবর্তে ভুল করে “dichi” লেখা হয়ে যায়। ফলে মেসেজটি চলে যায়:
“Tore 100 ber talak dichi”
অর্থাৎ, “তোরে ১০০ বার তালাক দিছি/দিয়েছি।”
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমার ভাইয়ের তালাক দেওয়ার কোনো নিয়ত ছিল না। তিনি “তালাক দিয়ে দিয়েছি” অর্থে লিখতে চাননি; তিনি শুধু ভয় দেখানোর জন্য “তালাক দিমু” লিখতে চেয়েছিলেন। “dichi” শব্দটি তার ইচ্ছাকৃত লেখা ছিল না।
মেসেজটি পাঠানোর পরপরই তিনি বুঝতে পারেন যে “dimu”-এর পরিবর্তে ভুল করে “dichi” লেখা হয়ে গেছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে মেসেজটি Delete করেন এবং পরে ফোন করে স্ত্রীকে জানান যে এটি typing mistake হয়েছে, তিনি ভুল করে লিখেছেন এবং তার উদ্দেশ্য ছিল “dimu” লেখা। তিনি এ জন্য ক্ষমাও চান।
আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন—আমার ভাই আগে জানতেন না যে তালাকের শব্দ এভাবে ব্যবহার করা শরিয়তের দৃষ্টিতে এতটা সংবেদনশীল ও গুরুতর বিষয় হতে পারে। তার উদ্দেশ্য ছিল শুধু স্ত্রীকে ভয় দেখানো, বাস্তবে তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছা তার ছিল না।
বিষয়টি ভাবি তার বাবাকে জানায় এবং তার বাবা মেয়ের শশুর শাশুড়িকে জানায়, বর্তমানে তারা দুজন সহ দুই পরিবারের সবাই বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত। তাদের একটি ছোট সন্তানও রয়েছে এবং তারা তাদের সংসার স্বাভাবিকভাবেই চালিয়ে যেতে চান।
আমাদের প্রশ্ন হলো:
১. এই পরিস্থিতিতে typing/Auto-correct-এর ভুলে WhatsApp-এ “Tore 100 ber talak dichi” লেখা ও পাঠানোর কারণে শরিয়ত অনুযায়ী তালাক সংঘটিত হয়েছে কি না?
২. যেহেতু স্বামীর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল “তালাক দিমু” লেখা এবং “তালাক দিছি” লেখার কোনো নিয়ত ছিল না, এই অনিচ্ছাকৃত typing mistake-এর কারণে কি তালাক কার্যকর হবে?
৩. মেসেজটি সঙ্গে সঙ্গে Delete করা এবং পরে ভুল বুঝতে পেরে স্ত্রীকে ফোন করে বিষয়টি জানানো এবং ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি কি শরয়ি হুকুম নির্ধারণে কোনো প্রভাব ফেলবে কিনা?
৪. যদি কোনো তালাক সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে “১০০ বার তালাক” বলার/লেখার ক্ষেত্রে কত তালাক গণ্য হবে?
অনুগ্রহ করে আমাদের বিষয়টি কুরআন ও সহিহ হাদিস এবং প্রয়োজনীয় ফিকহি রেফারেন্সসহ জানালে আমরা খুবই উপকৃত হব।
আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন এবং আমাদের সঠিক শরয়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দিন।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
সমাধানঃ
কেউ যদি তার স্ত্রীকে বলে বা লেখে যে, তোরে ১০০ বার তালাক দিছি বা দিচ্ছি, ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত, তাহলে সাধারণত ইসলামী শরীয়তের বিধান অনুযায়ী উক্ত স্ত্রীর উপর তিন তালাক পতিত হয়, এবং স্থায়ী বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। লিখিত বার্তা প্রেরণের পর যদি ডিলিট করে দেওয়া হয় বা স্ত্রীকে ফোন করে ক্ষমাও চাওয়া হয়, এর কারণে তালাকের বিধান পরিবর্তন হয় না।
টাইপিং ভুল এর কারণে এমনটা হওয়ার বাস্তবতা রয়েছে, তাই উপরোক্ত বর্ণনা অনুযায়ী টাইপিং মিস্টেকের কারণে যদি ঘটনা আসলেই এরকমই হয়ে থাকে যে, স্বামী তার স্ত্রীকে আসলে বলেছিল তোরে ১০০ বার তালাক দিমু, যা ভবিষ্যতে তালাক দিবে বোঝাচ্ছে, এখনো দেয়নি। তাহলে স্বামীর বর্ণনার ভিত্তিতে তিন তালাক কার্যকর হয় বলে প্রতিয়মান হয় না। তবে কেউ যদি তার স্ত্রীকে ভবিষ্যতে তালাক দেয়ার নিয়তে বলে যে আমি তোকে ১০০ বার তালাক দিমু, এক্ষেত্রে কোন তালাক কার্যকর হবে না।
এখানে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত তালাক দেওয়ার পর অস্বীকার করার একটি বিষয় রয়েছে, যদি কোন কারনেই এমনটা কোন কিছু ঘটে থাকে, সেক্ষেত্রে তালাক প্রদানের পর স্ত্রীর সাথে বসবাস করা জেনার অন্তর্ভুক্ত ও হারাম, তখন এ ধরনের হারাম কাজ সংগঠিত করার দায় স্বামীকেই নিতে হবে। ইসলামী শরীয়তের সর্বোচ্চ মানদন্ড তিন তালাক হিসেবে বিবেচিত, তাই ১০০ তালাকের প্রথম তিন তালাক পতিত হওয়ার পর স্ত্রী যেহেতু আর স্ত্রী হিসেবে বাকি নেই, এবং স্থায়ী বিচ্ছেদ হয়ে গেছে, তাই অতিরিক্ত তালাকগুলো পতিত হবে না।
সুত্রসমূহ
سورة البقرة: 230 فَإِن طَلَّقَهَا فَلاَ تَحِلُّ لَهُ مِن بَعْدُ حَتَّى تَنكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ فَإِن طَلَّقَهَا فَلاَ جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَن يَتَرَاجَعَا إِن ظَنَّا أَن يُقِيمَا حُدُودَ اللّهِ وَتِلْكَ حُدُودُ اللّهِ يُبَيِّنُهَا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ
سنن ابوداؤد: 2192 ثَلَاثٌ جَدُّهُنَّ جَدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جَدٌّ: النِّكَاحُ، وَالطَّلَاقُ، وَالرَّجْعَةُ
المبسوط للسرخسي: 6/143 (الثاني) أن يكتبَ طَلَاقَ امْرَأَتِهِ عَلَى مَا يَتَبَيَّنَ فِيهِ الخط، ولكن لا عَلَى رَسم كتب الرِّسَالَةِ فَهذا يَنْوِي فِيهِ: لِأَنَّ مِثْلَ هَذِهِ الكتابة قد تكون للإيقاع، وقد تكون لتجربة الخط، وَالْقَلَمِ، وَالْبَيَاضِ، وَفِيهِ يسوي كما في الألفاظ التي تشبه الطلاق، فإن كَانَ صَحِيحًا تَبِينُ نِيَّتُهُ بلسانه
الفتاوى الهندية: 1/378 إن كَانَتْ مُسْتَبِينَةً لَكِنهَا غَيْرُ مَرْسُومَةٍ إِنْ نَوَى الطَّلَاقَ يقع وإلا فلا
والله اعلم بالصواب
দারুল ইফতা, রহমানিয়া মাদরাসা সিরাজগঞ্জ, বাংলাদেশ।
![]()