কাবিন নামার ১৮ নং কলাম স্বামী ছাড়া অন্য কেউ পূরণ করলে এর বিধান কি?

ফতওয়া কোডঃ 235-তাখু-10-03-1448

প্রশ্নঃ

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ 

মুহতারাম আমি অত্যন্ত আবেগঘন ও জটিল একটি শরয়ী সমস্যার সঠিক সমাধানের জন্য আপনাদের দ্বারস্থ হয়েছি। অনুগ্রহ করে পুরো বিষয়টি বিবেচনা করে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ফতোয়া প্রদানে কৃতজ্ঞ থাকব।

বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার সময় কাবিননামার ১৭ ও ১৮ নম্বর কলামে (যেখানে স্ত্রীকে তালাক প্রদানের অধিকার বা তালাক-ই-তাফবীযের অনুমতি দেওয়া না দেওয়ার ঘর টি থাকে) আমি আমার স্ত্রীকে কোনো প্রকার তালাকের অধিকার প্রদান করিনি। বিয়ের মজলিসে কাবিননামার ১৭ ও ১৮ নম্বর ঘর দুটি সম্পূর্ণ খালি ছিল। মূল কাজী সাহেব সরাসরি আমাদের কাবিননামাটি পূরণ করেননি; বরং আমাদের সাথে যাওয়া আমার একজন পরিচিত ব্যাক্তি আমাদের সামনে সেটি পূরণ করেন এবং উক্ত কলাম দুটি খালি রাখেন। কিন্তু গত কয়েক দিন আগে আমি যখন কাজী অফিস থেকে মূল কাবিননামা তুলতে যাই, তখন দেখতে পাই যে, কাজী সাহেব আমার কোনো অনুমতি, জিজ্ঞাসা বা পরামর্শ ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছামতো স্বেচ্ছায় ১৮ নম্বর কলামটি পূরণ করে দিয়েছেন। সেখানে শর্ত হিসেবে লেখা হয়েছে— “বনিবনা না হলে এবং অবশিষ্ট মোহর আদায় না হলে, স্ত্রী তালাক গ্রহণ করতে পারবে]”।

বিগত কিছুদিন আগে আমার স্ত্রী তার বাপের বাড়ি বেড়াতে যায়। সেখানে যাওয়ার পর শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে সম্পূর্ণ একটি কুসংস্কার ও কাল্পনিক কুৎসা বুঝিয়ে বিভ্রান্ত করে। তারা আমার স্ত্রীর মনে এই বিশ্বাস স্থাপন করায় যে— আমার মা নাকি আমার স্ত্রীকে (তার অজান্তে) পিরিয়ডের রক্ত খাইয়েছেন এবং এর মাধ্যমে তার গর্ভের সন্তান নষ্ট (গর্ভপাত) করে ফেলেছেন! (নাউযুবিল্লাহ)
তারা ধারণা করে বলে যাচ্ছে— এই কারণে সন্তান হচ্ছে না। অথচ ওই সমস্যা বা অসুস্থতা বিয়ের পরে এমনকি বিয়ের আগেও আমার স্ত্রীর ছিল।

 বাস্তবতা হচ্ছে— এই জঘন্য ও কাল্পনিক অভিযোগের ব্যাপারে আমি বা আমার পরিবার বিন্দুমাত্র কিছুই জানি না। এবং পবিত্র কোরআন ও হাদিসের ভিত্তিতে যারা রুকাইয়া করেন, তাদের কয়েকজনের কাছে আমি নিজে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করেছি। তারা এটা সম্পূর্ণ ভূল বলেছেন এবং এমন কোন সমস্যা নাই বলেছেন।

আমার মা একজন স্বশিক্ষিত মানুষ, তিনি বলছেন, তিনি পবিত্র কোরআন শপথ / স্পর্শ করে বলতে পারবেন— এমন কিছু তিনি কখনোই করেননি। 

এই মিথ্যা ও অভিযোগের ভিত্তিতে তারা আমার স্ত্রীর মাধ্যমে আমাকে ‘তালাক-ই-তাফবীয’ বা ডিভোর্সের নোটিশ পাঠিয়েছে। আমি তাদের স্পষ্ট বলেছি, যদি তারা এই অভিযোগটির বিন্দুমাত্র সত্যতা প্রমাণ করতে পারে, তবে আমি আমার স্ত্রী ও সন্তানের অধিকার রক্ষার্থে আমার বাবা-মা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে নতুন বাসা নিয়ে থাকতে প্রস্তুত। কিন্তু তারা কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি, উল্টো আমার শ্বশুর আমাকে ‘নাস্তিক’ সহ বিভিন্ন আপত্তিকর কথা-বার্তা বলে যাচ্ছেন।

এমতাবস্থায়, শরীয়তের আলোকে নিচের প্রশ্নগুলোর জরুরি উত্তর জানতে চাচ্ছি:

১. বিয়ের মজলিসে স্বামী মুখে বা লিখিতভাবে স্ত্রীকে তালাকের কোনো অধিকার না দেওয়া সত্ত্বেও এবং কাবিননামার কলামটি খালি থাকা সত্ত্বেও, পরবর্তীতে কাজী সাহেব যদি নিজের ইচ্ছামতো বা কনের পক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ১৮ নম্বর ঘর পূরণ করেন, তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে উক্ত ‘তালাক-ই-তাফবীয’-এর কোনো কার্যকারিতা বা বৈধতা থাকবে কি?

২. শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে আমার মায়ের ওপর আনা গর্ভপাতের এই কুসংস্কারাচ্ছন্ন মিথ্যা অপবাদ এবং অবাস্তব অনুমানের ওপর ভিত্তি করে স্ত্রী যে তালাক দিল, ইসলামের দৃষ্টিতে সেই তালাকের হুকুম কী?

৩.এমতাবস্থায় আমি তালাক  না দেওয়া সত্ত্বেও, আমার জীবদ্দশায় সে অন্য কোন পুরুষের জন্য হালাল/বৈধ স্ত্রী হতে পারবে?
৪.স্বামীর অজান্তেই কাবিন নামার ১৭-১৮ নাম্বার কলমে কেহ এমন কিছু লিখে দিলো,
যে স্ত্রী তালাক নিতে পারবে। অথচ স্বামী এই বিষয়ে জানেই না, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ৭০ % পরুষ জানেই না, ১৭-১৮ নাম্বার কলমে কি লেখা আছে।এখন ক্বযাআন ( বিচারিক) ভাবে সিদ্ধান্ত কি হবে,
এবং দ্বিয়ানতান ( দায়বদ্ধতা) / শরীয়তের ফয়সালা কি হবে।

সমাধানঃ

بسم اللہ الرحمن الرحیم

কাবিননামায় স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেয়ার যে জায়গা রয়েছে, সেখানে ফাকা রেখে যদি স্বামী স্বাক্ষর করেন, এবং এর জন্য কমপক্ষে ২/৩ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে পারেন, যেমন কাজী সাহেব এবং আরো দুইজন যারা বিবাহের সাক্ষী হিসেবে ছিলেন তারা যদি সাক্ষী দেন যে উক্ত কলাম ফাকা ছিল। তাহলে পরবর্তীতে স্ত্রীকে তালাকের অগ্রিম অনুমতির জায়গা কাজী সাহেব বা অন্য কেউ পূরণ করলেও সেটা ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে না।

স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিতে পারবে এই ধরনের কোনো বিধান ইসলামে নেই, তাই এই ধরনের কোন কিছু ঘটলেও তালাক পতিত হবে না।

স্বামী বৈধভাবে স্ত্রীকে তালাক না দিলে এবং তালাক দেয়ার পর সঠিকভাবে ইদ্দত পালন না হওয়া পর্যন্ত, অন্যত্র বিবাহ হলে উক্ত বিবাহ বৈধ হবে না।

সুত্রসমূহ

سورة النساء: 34 الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاء بِمَا فَضَّلَ اللّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُواْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِّلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللّهُ وَاللاَّتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلاَ تَبْغُواْ عَلَيْهِنَّ سَبِيلاً إِنَّ اللّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيرًا

المحیط البرہانی: 3/240 والأصل في هذا: أن الزوج يملك إيقاع الطلاق بنفسه فيملك التفويض إلى غيره فيتوقف عمله على العلم؛ لأن تفويض طلاقها إليها يتضمن معنى التمليك، لأنها فيما فوض إليها من طلاقها عاملة لنفسها دون الزوج، والإنسان فيما يعمل لنفسه يكون مالكا

سورة النساء: 24 وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۖ كِتَابَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ

سورة البقرة: 228 وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ

والله اعلم بالصواب

দারুল ইফতা, রহমানিয়া মাদরাসা সিরাজগঞ্জ, বাংলাদেশ।

Loading

Scroll to Top